গণহত্যার ঘৃণ্য এক অধ্যায় জিনজিরা


Buriganga News প্রকাশের সময় : এপ্রিল ২, ২০২৩, ১১:৫৬ পূর্বাহ্ন /
গণহত্যার ঘৃণ্য এক অধ্যায় জিনজিরা

দিলশাদ হোসেন দোদুল : ২ এপ্রিল ১৯৭১। ঢাকার অদূরে জিনজিরায় পাকিস্তানি হানাদাররা ঘটায় এক বীভৎস গণহত্যা। মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা নিয়ে দেশে বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলেও জিনজিরা গণহত্যা। নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো গবেষণা এখন অবধি হয়নি। কবি নির্মলেন্দু গুণ ও শহিদজননী। জাহানারা ইমামের আত্মজীবনীমূলক লেখার মধ্য দিয়েই সাধারণ পাঠক এই ভয়াবহ গণহত্যার ব্যাপারে প্রথম জানতে পারে।

২০২১ সালে কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান ও দক্ষিণ এশিয়ার ওয়াটার এইডের আঞ্চলিক পরিচালক খায়রুল ইসলাম জিনজিরা হত্যাকাণ্ড নিয়ে ‘জিঞ্জিরা গণহত্যা: এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞের অধ্যায় শিরোনামে একটি যৌথ নিবন্ধ লেখেন দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায়। লেখকদ্বয় প্রদীপের আলো ফেলেন এড়িয়ে যাওয়া জিনজিরা গণহত্যা নিয়ে। তারা লিখেছেন, “জগৎজোড়া মানুষ ভিয়েতনামের ঐতিহাসিক মাই লাই গণহত্যার কথা জানে। কিন্তু তার চেয়েও ভয়ঙ্কর জিঞ্জিরা হত্যাকাণ্ডের খবর তেমন কেউ জানে না।

শাহাদুজ্জামান ও খায়রুল ইসলামের লেখার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে কবি নির্মলেন্দু গুণ ও জাহানারা ইমামের লেখার রেফারেন্স। জিনজিরা গণহত্যার প্রেক্ষাপট নিয়ে বলতে গিয়ে লেখকদ্বয় ঢাকায় তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর প্রেস অফিসার সিদ্দিক সালিকের লেখা ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইটি থেকে উদ্ধৃত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চিকিৎসা ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে তারা কথা বলেছেন বেশ কিছু পল্লি চিকিৎসক ও প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে।

অন্যদিকে কবি নির্মলেন্দু গুণ একাত্তরের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঢাকায় গণহত্যার পর

বুঝতে পেরেছেন। ওই খবরে যদিও গণহত্যার কথা ছিল না, তবু এটুকু ছিল যে পালিে বাহিনী নির্মম কোনো ঘটনা নদীর ওপাড়ে জিনজিরায় ঘটিয়েছে। একাত্তরের দোসরা এপ্রিলের পুরো ধারণা পাওয়া যায় নির্মলেন্দু গুণের স্মৃতিচারণ ও

জিনজিরার শুভাড্যা গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন। দোসরা এপ্রিল ভোররাতে গণহত্যা শুরু হলে কবি নির্মলেন্দু গুণ, হেলাল হাফিজ এবং তাদের আরেক বন্ধু নজরুল ঢাকায় ২৫ মার্চ প্রাণ বাঁচাতে পালাতে পালাতে যে ভয়ঙ্কর এবং নির্মমতম ইতিহাসের সাক্ষী তিনি গণহত্যার পর পালিয়ে জিনজিরার শুভাঢ্যায় দিন কাটাচ্ছিলেন নির্বিঘ্নে। তারা তখনও হয়েছিলেন, সেটিই লিখেছেন ছত্রিশ বছর পর। শহিদ জননী জাহানারা ইমাম তার একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থে লিখেছেন, জিনজিরায় যে দীর্ঘ ৩৬ বছর পর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নির্মলেন্দু গুণ ‘জিঞ্জিরা জেনোসাইড ১৯৭১ একটি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তার আঁচ তিনি মর্নিং নিউজ পত্রিকার একটি খবর থেকেই বইয়ে লিখেছেন- কেরানীগঞ্জের জিনজিরা, কালিন্দী ও শুভাঢ্যা ইউনিয়ন ঘিরে ফেলে।

ভাবতেও পারেননি কেরানীগঞ্জ ও জিনজিরার মানুষের জন্য সামনে কী অপেক্ষা করছে।

আমি আর আমার পরিবারের লোকজন পালিয়ে কিছুদুর যাওয়ার পরে আবিষ্কার করি আমার চার বছর বয়সী ছোট ভাইটার মাথায় গুলি ঢুকে তার খুলিটা মাথার পেছনের দিকে চলে। গেছে। এই দৃশ্যটা খুবই ভয়ঙ্কর ছিল। কখন যে গুলি লেগে ছোট ভাইটা মারা গেছে, সেটা আমরা কেউই বুঝতে পারিনি। আমি ছোট ভাইয়ের মাথার খুলিটা জায়গামতো বসিয়ে আমার পরনে থাকা পাঞ্জাবিটা খুলে মাথাটা বেঁধে দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে খেয়াল করি আমি আর আমার ছোট বোনও গুলিবিদ্ধ হয়েছি। ছোট বোন ছিল আমার কোলে। আমার পায়ে গুলি ঢুকে গিয়েছিল এবং ছোটবোনের গালে গুলি লেগে ফেটে গিয়েছিল। এই অবস্থাতে আমরা আবার আব্দুল্লাহপুরের দিকে রওনা হলাম। আশেপাশের বিভিন্ন দিক থেকে তখনও গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। পায়ের এই অবস্থা সত্ত্বেও আমি হাঁটতে থাকি। হাঁটতে ইটিতে আমরা অবশেষে আমাদের আব্দুল্লাহপুরের বাড়িতে পৌঁছাই।

কীভাবে পাকিস্তানি সেনারা নির্বিচারে গুলি ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল।

২ এপ্রিলে সংঘটিত গণহত্যার একজন প্রত্যক্ষদর্শী জিনজিরার অমৃতপুরের বাসিন্দা মো. তোফাজ উদ্দিন। তার বয়স ছিল তখন ১২ বছর। তার ভাষ্যে জেনে নেয়া যাক কতখানি ভয়াবহ ছিল দিনটি

২৫ মার্চের পর থেকে ঢাকা থেকে আমাদের বাড়িতে আশ্রয়ের জন্য প্রচুর মানুষ আসা শুরু করে। আমাদের বাড়িটা বড় বাড়ি হিসেবে পরিচিত ছিল, তাই এখানেই অনেক অসহায় মানুষ ঢাকা থেকে পালিয়ে আশ্রয়ের জন্য আসে। এভাবে কয়েকদিন চলার পরে আসল ২ এপ্রিল। ওইদিন ছিল বৃহস্পতিবার রাত ভোরের দিকে শুরু হলো ভয়ঙ্কর অ্যাটাক। শুরুতে মুহুর্মুহ মর্টার শেল আঘাত হানা শুরু করল। আমাদের পুরো বাড়িতে ছিল একতলা বড় বিল্ডিং এবং বেশ কয়েকটা টিনের ঘর। মর্টারের আঘাতে টিনের ঘরগুলো ঝাঁঝরা হয়ে দেল। মর্টারের ভয়ে আমিসহ অনেকেই বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলাম। মর্টার হামলার পরে শুরু হলো গুলি। আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া অনেক মানুষকে দেখলাম গুলি আর মর্টারের আঘাতে পড়ে যেতে।

এর মধ্যেই খবর পেলাম আমাদের বাড়িতে প্রায় ৫০টি লাশ পড়ে আছে তখনও। এর মধ্যে ছিল আমার বড় ভাই এক বোন জামাই, এক চাচা, পাশের গ্রামের এক ভাই পাশের বাসার অল্পবয়সী একটা মেয়ে, এবং বাকি সব লাশ ছিল ঢাকা থেকে এসে আমাদের বাড়িতে আশ্রায় নেওয়া মানুষজনের। পরে স্থানীয়রা এই লাশগুলোকে বাড়ির পাশেই কবরস্থানে দাফন করেছিল। এর পরদিন আমরা বাড়িতে ফিরে দেখতে পাই তখনও আমাদের কয়েকটি ঘরের মধ্যে রতের পুরু আছে।

গণহত্যার আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী জিনজিরার নজর সরদার বাড়ির বাসিন্দা মো. এরশাদুল হক। তার বয়স ছিল তখন ২৬ বছর। সেদিনটি কেমন ছিল শুনি তার ভাষো ২৫ মার্চের রাতে ঢাকায় চলা গোলাগুলির বিকট শব্দ আমরা কেরানীগঞ্জে বসেই শুনতে পাই। নদীর ধারে গিয়ে দেখি ঢাকার ওপার থেকে নৌকায় করে দলে দলে মানুষ এপারে আসতে থাকে আশ্রয়ের জন্য। অনেকেই তাদের স্বজনদের লাশ ঢাকায় দাফন করতে না পেরে সাথে করে এখানে নিয়ে আসেন। আমরা ওইসব লাশ দাফনে সহযোগিতা করি।

ঢাকা থেকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসা অনেকেই আমাদের সরদার বাড়িতে আশ্রয় নেয়। এভাবে কয়েকদিন যাওয়ার পরে আসে ২ এপ্রিল। ভোরবেলায় মর্টার আর গুলির বিকট শব্দে আমার ঘুম ভাঙে। আমরা যার যার ঘরে গিয়ে দরজা আটকে বসে থাকি। হঠাৎ দেখি আমাদের ঘরের পেছনের দিকে খালের দিক থেকে আর্মিরা আসতেছে। আবার আরেকটা

আমাদের ফেসবুক পেইজ